উপকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
উপকথা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৪

দেশ বিদেশের রূপকথা - থাইল্যান্ড

এক সময় এক দেশে ছিল দুই বন্ধু। তারা ছিল খুবই দরিদ্র, তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তাদের দেশেও খুব একটা কাজ ছিল না। ফলে যদিও তারা বেশ পরিশ্রমী ছিল, কিন্তু তবুও তারা সবসময় কাজ পেত না। অল্প যে সময় তারা কাজ পেত, মন দিয়ে সে কাজ করত। তাতে করে তারা ভালো পারিশ্রমিকও পেত। কিন্তু যেহেতু সবসময় কাজ থাকতো না, তাই তাদের উপার্জন খুব তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যেত। আবার কায়ক্লেশে চলতো তাদের দিন। এভাবে বছরের পর বছর চলে যায়, তাদের অবস্থার পরিবর্তন আর হয় না।

শেষ মেষ তারা খুব বিরক্ত হয়ে ঠিক করলো তারা শ্যাম দেশে চলে যাবে। বর্তমান থাইল্যান্ডের পূর্বনাম ছিল শ্যাম। তারা শুনেছিল শ্যাম দেশটা খুব ভালো দেশ ওখানে প্রচুর কাজ পাওয়া যায় আর ওখানকার লোকজনও খুব সুখে শান্তিতে থাকে। যেই ভাবা সেই কাজ - তারা নৌকা করে চলে এলো শ্যাম দেশে।

আরেব্বাসরে শ্যাম দেশটা কী সুন্দর!! যেদিকে চোখ যায়, সবুজ আর সবুজ। আর লোকজনকে দেখেই বোঝা যায় তারা ভীষন সুখী। দুই বন্ধু শ্যাম দেশে নেমে তো ভারী খুশী। তারা আরো বেশী খুশি হয়ে গেলো যখন প্রথম দিন নেমে নেমেই তারা কাজ পেয়ে গেলো। কঠোর পরিশ্রম করে সুষ্ঠু ভাবে সে কাজ সম্পাদন করায় তাদের উপার্জনও হলো বেশ ভালো।

সেদিন রাতে দুই বন্ধু তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা করতে বসেছে। তারা সিদ্ধান্ত নিলো যে করেই হোক, তারা প্রত্যেকে এক লাখ বাথ করে জমাবে। বাথ হলো শ্যাম দেশের মুদ্রা। আর যতদিন না তারা এক লাখ বাথ জমাতে পারছে, ততদিন তারা হাঁসের মাংস খাবে না। মানে, কোনরকম বিলাসিতার ধারে কাছ দিয়েও যাবে না।

পরদিন তারা দুজনে চলে গেলো শহরের দুই প্রান্তে। প্রথম বন্ধু খুঁজে পেতে একটা ছোট কাজ জোগাড় করে নিয়ে তাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সে কাজ করে যা উপার্জন করে, তার বেশীরভাগটাই জমানোর চেষ্টা করে। তার প্রতিদিনে আহার ছিল অল্প একটু ভাত, নোনতা শালগম আর লবণ। হাঁসের মাংস তো দূরের কথা, বাজারে সস্তায় যে ছোট মাছ পাওয়া যেত, সেদিকেও সে ফিরে তাকাতো না। তার একমাত্র চিন্তা ছিল কী করে এক লাখ বাথ জমাবে। তার সবসময় মনে পড়তো বন্ধুর কাছে করা প্রতিজ্ঞা, আর ওমনি সে আরো পরিশ্রম করার অনুপ্রেরণা পেয়ে যেত।

এই ভাবে কিছুদিন যাওয়ার পরে প্রথম বন্ধুর হাতে কিছু বাথ জমলো। তাই দিয়ে সে ছোটখাট একটা ব্যবসা শুরু করলো। সততা আর অধ্যবসায়ের সাথে ব্যবসা করায় তার ছোট পুঁজি ফুলে ফেঁপে উঠতে বেশীদিন সময় নিলো না। কিন্তু হাতে বেশ কিছু বাথ জমলেও এখনো তার সেই নোনতা শালগম আর ভাত খাবার রূটিনের কোন পরিবর্তন হলো না। বরং সে আরো বেশী করে তার ব্যবসাতে মন দিলো, আর নিজেকে বারে বারে স্মরণ করিয়ে দিলো তার বন্ধুর কাছে করা প্রতিজ্ঞা। ফলে তার ব্যবসা যেমন বাড়তে থাকলো, তার হাতে টাকা-পয়সাও জমতে থাকলো।

এভাবে বেশ কয়েক বছর কেটে যাওয়ার পর দেখা গেলো তার অনেক ধন সম্পদ হয়ে গেছে। এক লাখ বাথের থেকেও বেশী হয়ে গেছে তার সঞ্চয়। তখন সে একটা সুন্দর দেখে বাড়ি কিনলো। দাস-দাসী রাখলো। আর এবার সে একটু একটু করে হাঁসের মাংস কেনা শুরু করলো।

ওদিকে দ্বিতীয় বন্ধুও শহরের অন্য প্রান্তে একটা ছোট কাজ পেয়েছিল। সেও শুরু করলো কাজ করা। কিন্তু প্রথম দিন কাজ শেষে ফেরার পথে পথের ধারে মোটাসোটা একটা হাঁস বিক্রি হতে দেখে সে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না, কিনে ফেললো। নিজেকে বললো এই শেষ, আর কিনবো না, শেষ বারের মতো কিনলাম। রাতে খুব মজা করে সেই হাঁসের মাংস দিয়ে ভাত খেল।

পরের দিন কাজে যাবার সময় দ্বিতীয় বন্ধু নিজেকে মনে করিয়ে দিলো আজ কিন্তু আর হাঁসের মাংস কিনবো না। কিন্তু কাজ করতে করতে বারে বারে তার মনে হচ্ছিল গতকাল রাতের কথা হাঁসের মাংসটা কী সুস্বাদুই না ছিল! ওই খাবারের কথা চিন্তা করে তার কাজেও ভালো মতো মন বসছিল না। কোন রকমে কাজ শেষ করে সে আবার বাজারে গেলো। ভাবলো আজ মরা হাঁস কিনি। জ্যান্ত হাঁসের চেয়ে নিশ্চয়ই মরা হাঁসের দাম কম হবে। কিন্তু গোটা বাজার খুঁজেও সে কোথাও মরা হাঁস পেলো না। তখন বাধ্য হয়ে (!) সে একটা জ্যান্ত হাঁসই কিনে এনে মজা করে খেলো।

এইভাবে দ্বিতীয় বন্ধুর দিন যেতে থাকলো। সে প্রতিদিনই নিজের কাছে বলতো আজই শেষ, কিন্তু সেই শেষ দিনটা আবার পরের দিনে পাল্টে যেতে থাকলো। প্রতিজ্ঞা একবার ভাংলে তা বারবারই ভাংতে থাকে। সে হাঁস ছাড়াও মুরগী, গরু, শুয়োর - সবই খাওয়া শুরু করলো। ফলে তার হাতে আর বাথ জমে না। সে যা উপার্জন করে, সবই চলে যায় খাওয়ার পিছনে। কয়েক বছর পরেও তার কোন উন্নতি হলো না, শ্যাম দেশে আসার সময় সে যেমন দরিদ্র ছিল, তেমনই রয়ে গেলো।

যখন বেশ কয়েক বছর পরেও তার অবস্থার কোন পরিবর্তন হলো না, সে ভাবলো যাই, আমার বন্ধুটা কেমন আছে দেখে আসি। এই ভেবে সে চললো শহরের অন্যপ্রান্তে। সেখানে গিয়ে সে যাকেই তার বন্ধুর কথা জিজ্ঞেস করে, সেই তাকে একটা খুব সুন্দর বাড়ি দেখিয়ে দেয়। সে তো খুব অবাক এত সুন্দর আমার বন্ধুর বাড়ি! তার বিশ্বাস হতে চায় না। শেষে অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্বের পর সে সাহসে ভর করে ঢুকলো সেই বাড়িতে।

প্রথম বন্ধু দ্বিতীয় বন্ধুকে দেখেই বুঝতে পেরেছে তার অবস্থা। বন্ধুর পরনের মলিন পোশাক আর তার জীর্ণ চেহারা দেখেই সে আন্দাজ করেছে। কিন্তু কিছু বুঝতে না দিয়ে প্রথম বন্ধু তাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালো। নরম গলায় বললো এসো, তুমি থাকো আমার সাথে। এই বলে সে তার বাড়ির পেছনের একটা ঘর খুলে দিলো বন্ধুকে থাকতে।
খাওয়ার সময় হলে সে তার বন্ধুর জন্য পাঠালো ভাত, শালগম আর লবন। সেই সাথে তাকে দেখিয়ে দিলো একটা তেঁতুল গাছ। বললো খাওয়ার সময় এই গাছের অল্প কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে নিও তুমি, সেদ্ধ করে লবন আর ভাতের সাথে খেতে ভালো লাগবে।

কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই গাছটির সব পাতা শেষ করে ফেললো দ্বিতীয় বন্ধু। তারপর সে আরেকটি গাছের পাতা ব্যবহারের অনুমতি চাইতে গেলো বন্ধুর কাছে। শুনে মুচকি হাসলো তার বন্ধু। বললো দেখো, গাছটার পাতা বেশী বেশী করে খেয়ে সব পাতা শেষ করে ফেলেছো তুমি। যদি তা না করে ছোট ডালটা থেকে অল্প করে পাতা নিতে, তাহলে তোমার বড় ডালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ছোট ডালে আবার পাতা গজিয়ে যেত। তুমি নিজে নিজের উপরেও ঠিক এই কাজটিই করেছ। যখন তোমার বাথ জমানোর কথা তখন তুমি বিলাসিতার পেছনে তা উড়িয়ে দিয়েছ। ভবিষ্যতের কথা না ভেবে তুমি মজা করে হাঁসের মাংস খেয়েছ। তার ফলেই তোমার এই অবস্থা হয়েছে।


এই শুনে দ্বিতীয় বন্ধুর খুব অনুতাপ হলো। সে এর পর থেকে কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি মিতব্যয় করা শুরু করলো। ফলে কিছু দিনের মধ্যেই তার হাতে কিছু বাথ জমে গেলো। তখন প্রথম বন্ধু তাকে ব্যবসা করা শেখালো। নিজের সঞ্চয় করা পুঁজি আর বন্ধুর পরামর্শ মত ব্যবসা করে সেও কয়েক বছরের মধ্যে একজন ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেললো।

গ্রীক পুরাণের উপাখ্যান - ইউরোপা অপহরণ

ভূমধ্যসাগরের তীরে সুজলা সুফলা এক শান্তিপূর্ণ রাজ্য ফিনিশিয়া। সেখানে রাজত্ব করেন রাজা এজিনর। রাজা এজিনর আর রাণী টেলেফাসার দুই ছেলে আর এক মেয়ে। দুই ছেলে ক্যাডামাস আর সিলিক্স (যার নামানুসারে পরে সিসিলিয়া দ্বীপের নাম রাখা হয়েছে)। আর একমাত্র মেয়ে রাজকন্যা ইউরোপা। (কারো কারো মতে ইউরোপা ছিল রাজা ফিনিক্সের কন্যা, যে ফিনিক্সের নামানুসারে ফিনিশিয়া রাজ্যের নামকরণ হয়েছিল)। তো যাই হোক, এই রাজকন্যা ইউরোপা ছিল অসামান্যা রূপসী। তার রূপ দেখলে সবাই থ হয়ে তাকিয়ে থাকে, মুখে আর কথা সরে না। 

এক রাতে স্বপ্ন দেখে ইউরোপার ঘুম ভেঙে গেল। সে স্বপ্নে দেখে দুই মহাদেশ দুই নারীর বেশ ধরে এসে তার উপরে নিজেদের দাবী জানাচ্ছে। একজন হলো এশিয়া মহাদেশ। সে বলে যেহেতু এশিয়ায় জন্ম, তাই ইউরোপার উপরে তার দাবীই যথার্থ। কিন্তু অপর মহাদেশ, যার এখনো কোন নাম নেই, সরবে ঘোষনা করছে জন্মস্থান মোটেই গুরুত্বপূর্ণ না কারণ দেবরাজ জিউস তার কাছে ইউরোপাকে উপহার দেবেন।

এই রকম স্বপ্নের মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে না পেরে ইউরোপা কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকলো। তারপর ভোর হয়ে এসেছে দেখে সখীদেরকে ডেকে ফুল তুলতে গেলো। সাগর পাড়ে রাজা এজিনরের রাজপ্রাসাদ। সুনীল জলরাশি এসে লুটিয়ে পড়ছে বালুকাবেলায়। আর তার পাশেই বিশাল এক বাগান। কত রকমের ফুল সেখানে। গুচ্ছে গুচ্ছে ফুটে আছে রকমারী সব ফুল, মৃদুমন্দ হাওয়ায় দুলছে অল্প অল্প। আর কী তাদের বাহার। বোধহয় তারই আকর্ষণে ছুটে এসেছে অলির দল, গুঞ্জন তুলেছে এখানে ওখানে। এমন চমৎকার রোদ ঝলমলে ফুটফুটে দিনে বাগানের রাশি রাশি ফুলের মাঝে কোথায় উড়ে গেলো ইউরোপার রাতের স্বপ্ন! ইউরোপা ব্যস্ত হয়ে পড়লো সখীদের সাথে খেলায় আর ফুল তোলায়।

এদিকে হয়েছে কী দেবরাজ জিউস তাঁর অলিম্পাসের প্রাসাদে বসেছিলেন। হঠাৎই তাঁর নজর পড়লো ফিনিশিয়ার সাগর তীরে ইউরোপাদের উচ্ছল দলটির উপরে। ইউরোপার নজরকাড়া সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত হয়ে গেলেন তিনি। আর ঠিক ওই সময়েই প্রেমের দেবতা এরস এসে হাজির হলেন জিউসের কাছে। জিউসকে মুগ্ধ নয়নে ইউরোপার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হাসলেন তিনি। তারপর তাঁর হাতের ধনুক থেকে ছুঁড়লেন একটি পুষ্পশর সোজা জিউসের দিকে। ব্যস, আর যায় কোথা, মুহূর্তেই ইউরোপার প্রেমে পড়ে গেলেন দেবরাজ। এমনিতেই ইউরোপার অনিন্দ্যসুন্দর রূপ আর অপরূপ দেহবল্লরী মুনি ঋষিদেরও ধ্যান ভাঙিয়ে দেয়, তার উপরে প্রেমের দেবতার শর! দেখতে না দেখতেই জিউস প্রেমাবেগে পাগলপারা হয়ে উঠলেন।

জিউস পত্নী হেরা তখন ব্যস্ত ছিলেন অন্যদিকে। এই সুযোগে জিউস নিজেকে রূপান্তরিত করলেন ধবধবে সাদা একটা ষাঁড়ে। তারপর এসে নামলেন সাগরপাড়ের ফুলবাগানে, যেখানে ইউরোপা ব্যস্ত বান্ধবীদের নিয়ে ফুল তোলায়।
ইউরোপা আর তার বান্ধবীরা তো ষাঁড়টিকে দেখে রীতিমত অবাক! এত সুন্দর যে কোন প্রাণী হতে পারে, তা তাদের ধারণারও বাইরে ছিল। কী ফুটফুটে গায়ের রঙ! ঠিক যেন শরীর থেকে ঠিকরে পড়ছে জ্যোছনা! আর বাগানের সব ফুলের গন্ধ ম্লান হয়ে যায় এর সৌরভে। সুরেলা গলায় মৃদু শব্দ করতে করতে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে ষাঁড়টি। শব্দ তো নয়, মনে হচ্ছে যেন মৃদুমন্দ লয়ে বাজনা বাজছে কোথাও! ষাঁড়টিকে সবাই মিলে ঘিরে ধরলো।

আশ্চর্য! ষাঁড়টি ভয়ও পাচ্ছে না ইউরোপাদেরকে।বরং গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে আরামে সুরেলা শব্দ করছে। আর ইউরোপা যখন গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো তখন তো ষাঁড়টি রীতিমতো প্রায় একটা গানই গেয়ে ফেললো!

ব্যাপারস্যাপার দেখে ইউরোপার তো খুশী আর ধরে না। খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো সে, আর তার তৈরী করা ফুলের মালাগুলো জড়িয়ে দিলো ষাঁড়ের গলায় আর শিঙে। ষাঁড়ও যেন খুশি ইউরোপার আদর পেয়ে। আস্তে করে সামনের পা জোড়া মুড়ে পিঠ নিচু করে দাঁড়ালো। আনন্দে বাচ্চা মেয়ের মতো লাফ দিয়ে ষাঁড়ের পিঠে উঠে পড়লো ইউরোপা।

যেই না ইউরোপা তার পিঠে উঠেছে, সঙ্গে সঙ্গে পিঠ সোজা করে ফেললো সেই ষাঁড়, আর তীর বেগে ছুটলো সাগরের দিকে। হায় হায় করতে করতে ইউরোপার সখীরা ছুটলো ষাঁড়ের পিছু পিছু। কিন্তু তারা তো সাধারণ মানবী। হোক না উচ্চবংশীয়, মানুষ তো। পারবে কেন ষাঁড়রূপী দেবরাজের সাথে? দেখতে না দেখতে ষাঁড়টি ইউরোপাকে পিঠে নিয়ে নেমে পড়লো সমুদ্রে। আর সখীরা সাগরের তীরে বসে আকুল নয়নে কাঁদতে থাকলো।

ষাঁড়ের পিঠে বসে ইউরোপা দেখছে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে তার প্রিয় ফিনিশিয়ার তটরেখা তাকে নিয়ে ষাঁড়টি দ্রুতবেগে সাঁতরে চলেছে গভীর থেকে আরো গভীর সমুদ্রে। আর তাদের আশেপাশে রীতিমতো মিছিল তৈরী করে ফেলেছে বিভিন্ন জীব জন্তু আর দেবতার দল। ডলফিনের পিঠে চেপে এসেছে নারিয়ার্ডসরা, চক্কর দিচ্ছে তাদেরকে ঘিরে। সমুদ্রদেব পসাইডনের ছেলে ট্রাইটনকে দেখা যাচ্ছে মহানন্দে তার শঙ্খ বাজাচ্ছে। আরে ওইতো, সমুদ্র দেবতা পসাইডন নিজেও আছেন দেখা যাচ্ছে!

ইউরোপার আর বুঝতে বাকি নেই যে এই ষাঁড়টি একটি ছদ্মবেশী দেবতা। সে করুণ সুরে কাকুতি মিনতি করতে লাগলো দেবতার কাছে যেন তাকে ছেড়ে দেয়া হয়, তাকে তার দেশে ফিরিয়ে দিয়ে আসা হয়। জিউস তখন ইউরোপাকে জানালেন তাঁর মুগ্ধতার কথা। ইউরোপার প্রতি তাঁর প্রগাঢ় প্রণয়ের কথা সবিস্তারে বললেন।

এরপর জিউস ইউরোপাকে নিয়ে এলেন ক্রীট দ্বীপে। সেই ক্রীট দ্বীপ যেখানে জিউস নিজে জন্মেছিলেন এবং বেড়ে উঠেছিলেন। ডিক্টে গুহা যেখানে জিউস জন্মগ্রহণ করেন, রূপ নেয় জিউস আর ইউরোপার প্রেমকুঞ্জে। এখানেই ইউরোপার গর্ভে জিউসের তিন পুত্র সন্তান হয়। এদের মধ্যে মিনোস পরে ক্রীট দ্বীপের রাজা হয়েছিলেন এবং বিখ্যাত মিনোয়ান বংশের সূচনা করেছিলেন।

জিউস ইউরোপার প্রতি তাঁর ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ ইউরোপাকে তিনটি উপহার দেন। প্রথম উপহার ছিল টালোস নামে ব্রোঞ্জের তৈরী একটি সৈনিক, যে ক্রীট দ্বীপের পাহারাদার ছিল। দ্বিতীয় উপহারটি ছিল একটি অদ্ভুত সুন্দর ও দক্ষ শিকারী কুকুর যার নাম লাইয়েল্যাপস। আর তৃতীয় ও শেষ উপহারটি ছিল একটি বর্শা যা কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়না।
কথিত আছে যে ক্রীট দ্বীপের গোরটিন ছিল ইউরোপা আর জিউসের প্রথম মিলনস্থল। তাঁরা মিলিত হয়েছিলেন একটা সাধারণ গাছের নীচে। পরে জিউসের আশীর্বাদে এই সাধারণ গাছটি পরিনত হয় একটি চির-হরিৎ বৃক্ষে। আর যে ষাঁড়ের ছদ্মবেশ নিয়েছিলেন জিউস, তাকে অমর করে রাখা হয় তারকামন্ডলীতে স্থান দিয়ে। বৃষ রাশিই হচ্ছে সেই তারকামন্ডল।

ইউরোপার অপহরণের কাহিনি আজো লোকের মুখে মুখে ফেরে। তাইতো ইউরোপা অপহরণের এই কাহিনি নিয়ে চিত্রকর্মের পাশাপাশি ২ ইউরো মানের গ্রিক মুদ্রায় খোদিত হয় ষাঁড়রূপী জিউস কর্তৃক ইউরোপা অপহরণের দৃশ্য। আর ইউরোপ মহাদেশের নামকরণ করা হয় ইউরোপা থেকেই যেমনটি ইউরোপার স্বপ্নে ছিলো।